মো: আশিকুর রহামন স্বাধীন
অধ্যায় দুই
ভাঙনের শব্দ
বিয়ের পর প্রথম কয়েক মাস মায়া নিজেকেই বোঝাতে চেয়েছিল—সব সংসারেই একটু আধটু ঝামেলা থাকে। রাশেদের চোখে তখনো পুরো অন্ধকার নামে নি। কিন্তু অন্ধকার আসতে সময় নেয় না, শুধু কারণ খোঁজে।
শুরুটা ছিল কথায়। দেরি কেন হলো, কার সঙ্গে কথা বললে, ফোন এতক্ষণ হাতে কেন—প্রশ্নগুলো ধীরে ধীরে অভিযোগে রূপ নেয়। অভিযোগ থেকে জন্ম নেয় সন্দেহ। আর সন্দেহের সঙ্গে সঙ্গে রাশেদের হাতের ভাষাও বদলাতে থাকে। সেই হাত আর আশ্বাস দেয় না, হিসাব চায়।
এক সন্ধ্যায় মায়া রান্নাঘরে দেরি করেছিল। গ্যাস শেষ হয়ে গিয়েছিল, সে নতুন সিলিন্ডার আনাতে নিচে নেমেছিল। ফিরে এসে দেখে রাশেদের চোখ লাল। কথা বলার সুযোগ না দিয়েই সে চিৎকার শুরু করে। তারপর হঠাৎ—একটা ধাক্কা। মায়া মেঝেতে পড়ে যায়। শরীরের চেয়ে বেশি ব্যথা পায় তার মন। এই প্রথম সে বুঝতে পারে, ভালোবাসার মুখোশ খুলে গেছে।
সেদিন রাতে রাশেদ কেঁদেছিল। বলেছিল, “রাগ হয়ে গিয়েছিল, আর হবে না।” মায়া বিশ্বাস করতে চেয়েছিল। কারণ সমাজ তাকে শিখিয়েছে—নারীর সহনশীলতাই সংসার টিকিয়ে রাখে। সে নিজের ক্ষত ঢেকে রাখে শাড়ির আঁচলে, আর মনটাকে বোঝায়—সব ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু ঠিক আর হয় না। নির্যাতন একদিনে আসে না, আসে ধাপে ধাপে। ধাক্কা থেকে চড়, চড় থেকে ঘুষি। মাঝখানে থাকে ক্ষমা আর প্রতিশ্রুতির অভিনয়। রাশেদের হাত তখন আর হাত নয়, হয়ে ওঠে অস্ত্র।
মায়া ধীরে ধীরে চুপ করে যেতে শেখে। সে আর নিজের কথা বলে না। হাসি কমে যায়। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজের চোখ চিনতে পারে না। রাতে ঘুম ভাঙে চমকে—কোনো শব্দ ছাড়াই কান্না আসে। মানসিক ভাঙন শরীরের ক্ষতের চেয়েও গভীর হয়।
সবচেয়ে কষ্টের ছিল অপমান। রাশেদ বলত, “তুমি ছাড়া আমি কিছু না, আবার তোমার কারণেই আমার সব নষ্ট।” এই দ্বন্দ্বে মায়া নিজেকেই দোষী ভাবতে শুরু করে। নির্যাতন শুধু শরীর ভাঙে না, আত্মবিশ্বাসও চূর্ণ করে।
একদিন প্রতিবেশী নারীটি ফিসফিস করে বলেছিল, “সব সহ্য করো না মা, শেষ ভালো হয় না।” কথাটা মায়ার মনে গেঁথে যায়। সেই রাতেই সে প্রথম ভাবল—চুপ থাকা কি সত্যিই শান্তি আনে?
রাতের অন্ধকারে নদীর শব্দ শুনতে শুনতে মায়া বুঝতে পারে, সে ভেঙে পড়েছে ঠিকই, কিন্তু পুরোটা শেষ হয়ে যায়নি। ভাঙনের মাঝেই জন্ম নেয় প্রশ্ন, আর প্রশ্ন থেকেই জন্ম নেয় প্রতিরোধের প্রথম আলো। —– চলবে