অধ্যায় আট
রায় আসে—সম্পূর্ণ নয়, তবু গুরুত্বপূর্ণ। আদালত নির্যাতনের সত্যতা স্বীকার করে। শাস্তি সীমিত হলেও রায়টি নজির হয়। সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করে। মায়া ছোট করে বলে, “ন্যায় কখনো একদিনে আসে না।”
সে জানে, এই রায় শুধু কাগজের নয়—অনেক নারীর সাহসের তালিকায় যুক্ত হলো আরেকটি লাইন।
অধ্যায় নয়
নতুন পথ মায়া একটি এনজিওতে কাজ শুরু করে। অন্য নারীদের কাগজপত্রে সাহায্য করে, শুনে তাদের গল্প। প্রতিটি গল্পে সে নিজের ছায়া খুঁজে পায়—আর তাতে ভয় পায় না।রাতে ডায়েরিতে লেখে: ‘ভালোবাসা মানে নিরাপত্তা।’ এই বাক্যটা সে নিজের জন্যই লিখে রাখে।
অধ্যায় দশ
খোলা আকাশের নিচে নদীর ধারে আবার দাঁড়ায় মায়া। এবার তার পাশে আরও কয়েকজন নারী। সবাই হাত মেলে ধরে। বাতাসে তাদের কণ্ঠ মিশে যায়। মায়া জানে, এই গল্প এখানেই শেষ নয়—এটা চলমান।
অধ্যায় এগারো
প্রেমের নতুন সংজ্ঞা মায়া ভেবেছিল, প্রেম বুঝি আর তার জীবনে আসবে না। ‘প্রেম’ শব্দটার সঙ্গে এতদিন ভয়, দখল আর শর্ত জড়িয়ে ছিল যে সে শব্দটাকেই দূরে সরিয়ে রেখেছিল। কিন্তু সময়, মানুষকে ধীরে ধীরে নতুন অর্থ শেখায়।
এনজিওতে কাজ করতে গিয়ে সে পরিচিত হয় আদিলের সঙ্গে। আদিল কোনো নায়কোচিত মানুষ নয়। উচ্চস্বরে কথা বলে না, পরামর্শ চাপিয়ে দেয় না। প্রয়োজন হলে পাশে দাঁড়ায়, না হলে সম্মানের সঙ্গে দূরে থাকে। মায়ার কাজে সে আগ্রহ দেখায়, মায়াকে বদলাতে চায় না।
একদিন মায়া অসুস্থ হলে আদিল শুধু জিজ্ঞেস করে, “আমি কি কিছু করতে পারি?”—এই প্রশ্নে কোনো দাবি নেই, কোনো অধিকার ফলানোর চেষ্টা নেই। মায়া অবাক হয়ে বোঝে, এ-ও প্রেমের ভাষা হতে পারে।
তারা একসঙ্গে হাঁটে, কথা বলে। সম্পর্কের নাম দিতে তাড়া নেই। মায়া শিখে নেয়—প্রেম মানে নজরদারি নয়, ভয় দেখানো নয়। প্রেম মানে নিরাপদ নীরবতা, যেখানে নিজের মতো থাকা যায়।
এক সন্ধ্যায় মায়া স্পষ্ট করে বলে, “আমি নিজেকে হারাতে চাই না।” আদিল হেসে উত্তর দেয়, “তাহলে তো সম্পর্কটাই ঠিক জায়গায় আছে।” এই কথায় মায়ার বুকের ভেতর দীর্ঘদিন পর শান্তি নামে।
সে বুঝতে পারে, প্রেম মানে কারো হাতের ভেতর বন্দি থাকা নয়। প্রেম মানে পাশাপাশি হাঁটা—যেখানে দু’জনের হাতই মুক্ত।
অধ্যায় বারো
পুরোনো ক্ষতের শব্দ
শান্তি এলেও ক্ষত পুরোপুরি চুপ থাকে না। কোনো কোনো রাতে মায়া ঘুম ভেঙে উঠে বসে। জানালার ফাঁক দিয়ে আলো ঢোকে, কিন্তু বুকের ভেতরের অন্ধকারটা তখনো কথা বলতে চায়। স্মৃতি আসে—কিছু শব্দ, কিছু নীরবতা, কিছু দরজা বন্ধ হওয়ার আওয়াজ।
আগে এসব স্মৃতি তাকে ভেঙে দিত। এখন সে পালায় না। ডায়েরি খুলে লিখে ফেলে—আজ কী মনে পড়ল, কোথায় ব্যথা লাগল। সে বুঝেছে, ক্ষত ঢেকে রাখলে পচে যায়, খুলে দেখলে সারে।
একদিন নারী সহায়তা সভায় সে বলে,
“আমি এখনো ভয় পাই। কিন্তু ভয় পাওয়াটাও এখন আর লজ্জার নয়।”
ঘরে নীরবতা নামে—তারপর ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি।
মায়া বোঝে, সুস্থ হওয়া মানে কখনোই নিখুঁত হয়ে যাওয়া নয়। সুস্থ হওয়া মানে নিজের ভাঙনগুলোকে চিনে নেওয়া।