পাবনার ক্রিকেটাঙ্গন আজ যে জায়গায় দাঁড়িয়ে, তার পেছনের গল্পটা কেবল সাফল্যের নয়—এটা একদল স্বপ্নবাজ মানুষের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, ত্যাগ আর অদম্য নিষ্ঠার গল্প। একটা সময় ছিল, যখন এই ক্রিকেটাঙ্গন ছিল একেবারে আঁতুরঘরে। সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুর মতোই তখনকার ক্রিকেটাররা—হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগোচ্ছে, বুঝে উঠতে পারছে না কোন পথে যাবে, কীভাবে নিজেদের গড়ে তুলবে।
ঠিক সেই সময়টাতেই এগিয়ে এসেছিলেন কিছু মানুষ—নিজেদের ব্যক্তিগত কাজ, পরিবার, ব্যস্ততা সবকিছু পাশে রেখে। দিনের পর দিন, রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে তারা ছুটে যেতেন এডওয়ার্ড কলেজ মাঠে। সেখানে তারা শুধু ক্রিকেট শেখাতেন না, তারা গড়ে তুলতেন মানুষ। সেই আলোকিত মানুষদের ভিড়ে সবচেয়ে আপন, সবচেয়ে হৃদয়ের কাছের নামটি—রাধানগরের খুশী ভাই।
খুশী ভাই ছিলেন না শুধু একজন সিনিয়র বা কোচ। তিনি ছিলেন আমাদের আশ্রয়, আমাদের সাহস, আমাদের ভরসার জায়গা। তার চোখে আমরা ছিলাম না শুধু খেলোয়াড়—ছিলাম তার নিজের সন্তানের মতো। কতটা মমতা, কতটা ভালোবাসা থাকলে একজন মানুষ অন্যের সন্তানদের জন্য নিজের সবকিছু বিলিয়ে দিতে পারেন—তা খুশী ভাইকে না দেখলে বোঝা যায় না। মাঠে ভুল করলে ধমক দিতেন, আবার সেই তিনিই পাশে বসিয়ে বুঝিয়ে দিতেন জীবনের আসল শিক্ষা।
আজ যখন পেছনে তাকাই, তখন মনে হয়—আমরা কত ভাগ্যবান ছিলাম! আমাদের মাথার ওপর এমন একজন বটবৃক্ষ ছিল, যার ছায়ায় দাঁড়িয়ে আমরা বড় হয়েছি, নিজেদের খুঁজে পেয়েছি।
শুধু খুশী ভাই নন—মুক্তা ভাই, তারা ভাই, মাসুদ ভাই, রানু ভাই, রন্টু বিশ্বাস, ওহাব স্যার, বাসু ভাই—এমন অসংখ্য নাম জড়িয়ে আছে এই পথচলার সঙ্গে। তারা ছিলেন প্রদীপের মতো—নিজেরা জ্বলে পুড়ে আলো দিয়েছেন, আর সেই আলোয় আমরা পথ চিনেছি। তাদের হাত ধরেই পাবনার ক্রিকেট একদিন মাথা তুলে দাঁড়াতে শিখেছে।
কিন্তু সময় বড় নির্মম। আজ তারা অনেকেই বয়সের ভারে ক্লান্ত, কারো চোখে আর আগের সেই ঝলক নেই, কারো পা আর আগের মতো দৌড়াতে পারে না। আর কেউ কেউ তো চিরদিনের জন্য চলে গেছেন—ফিরে না আসার দেশে। তবুও তাদের স্মৃতি, তাদের ভালোবাসা আজও আমাদের ঘিরে রাখে, নিঃশব্দে।
সবচেয়ে কষ্টের জায়গাটা হলো—আমরা, নতুন প্রজন্ম, ধীরে ধীরে ভুলে যাচ্ছি আমাদের শিকড়। আমরা ব্যস্ত হয়ে গেছি নিজের জীবন, নিজের সাফল্য নিয়ে। সময় পাই না একবার খোঁজ নিতে, একবার কৃতজ্ঞতা জানাতে। শ্রদ্ধা জানানোতেও যেন কুণ্ঠা কাজ করে! অথচ আমরা ভুলে যাই—আজ আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে, সেটা তাদের কাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে।
চতুর্থ আসাদ স্মৃতি টি-২০ ক্রিকেট টুর্নামেন্ট ২০২৫-এ, এডওয়ার্ড কলেজ মাঠে যখন অসুস্থ শরীর নিয়ে খুশী ভাইকে দেখতে পেলাম, তখন বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠেছিল। এত কষ্ট নিয়েও তিনি এসেছেন—তার ভালোবাসার মাঠ দেখতে, তার সন্তানদের মতো ক্রিকেটারদের দেখতে। এই দৃশ্য যেন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল—ভালোবাসা কখনো মরে না, দায়িত্ব কখনো শেষ হয় না।
আজ আমাদের দায়িত্ব—তাদের মনে রাখা, তাদের সম্মান করা, তাদের ভালোবাসার মূল্য দেওয়া। কারণ শিকড় ভুলে গেলে কোনো গাছই টিকে থাকতে পারে না।
আল্লাহ তাআলা আমাদের এই বটবৃক্ষসম মানুষদের দীর্ঘ জীবন দিন, সুস্বাস্থ্য দান করুন। আর আমাদের দান করুন সেই হৃদয়—যাতে আমরা তাদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব, আমাদের ভালোবাসা আর আমাদের কৃতজ্ঞতা কখনো ভুলে না যাই।