আমার মা এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের মেয়ে। ছোটবেলা থেকেই তাকে দেখেছি খুব শান্ত, ধৈর্যশীল আর মমতাময়ী একজন মানুষ হিসেবে। তিনি কখনো বেশি কথা বলেন না, কিন্তু তার প্রতিটি কাজে, প্রতিটি স্পর্শে লুকিয়ে থাকে গভীর ভালোবাসা।
এসএসসি পরীক্ষা শেষ। বন্ধুরা মিলে ঠিক করলাম বনভোজনে যাবো। সবাই খুব উত্তেজিত, কিন্তু আমার মনে এক ধরনের অস্বস্তি—বাবার কাছে টাকা চাইতে ভয় লাগছিল। সাহস পাচ্ছিলাম না কিছু বলার।
মা কেন জানি সব বুঝে ফেললেন। মাথায় হাত বুলিয়ে খুব নরম স্বরে বললেন, “কিছু লাগবে? টাকা প্রয়োজন?”আমি একটু ইতস্তত করে বললাম, “বন্ধুদের সঙ্গে বনভোজন করবো…”মা হেসে বললেন, “ঠিক আছে।”পাঁচ মিনিট পর তিনি ফিরে এসে আমার হাতে পাঁচশ টাকা দিলেন। অথচ আমার এত টাকার প্রয়োজনই ছিল না। কিন্তু সেই মুহূর্তে টাকার চেয়েও বড় ছিল মায়ের বোঝাপড়া—না বললেও বুঝে যাওয়া, না চাইতেই দিয়ে দেওয়া। সেই ভালোবাসার স্পর্শ আজও আমার হৃদয়ে গেঁথে আছে।সময় গড়ালো। বড় হলাম। জীবনের প্রয়োজনে চাকরির জন্য বাড়ির বাইরে থাকতে হলো। নতুন শহর, নতুন মানুষ, নতুন সংগ্রাম—সবকিছু মিলিয়ে জীবনটা যেন অন্যরকম হয়ে গেল। তখনই বুঝতে পারলাম, ঘরের ভেতর যে মানুষটা নীরবে আমার জন্য সবকিছু সহজ করে দিতেন, তিনি কতটা বড় আশ্রয় ছিলেন।দূরে থাকলেও একটা অদ্ভুত বিষয় আমি বারবার অনুভব করেছি—আমার যখনই কোনো কিছুর প্রয়োজন হতো, কিংবা মন খারাপ থাকতো, মা যেন দূর থেকেই তা বুঝে যেতেন। হঠাৎ ফোন করে বলতেন, “তোর কি কিছু লাগবে?” বা “মন খারাপ নাকি?”আমি অবাক হয়ে যেতাম। অনেক সময় কিছু বলার আগেই মা ঠিকই জেনে যেতেন আমার মনের খবর। কখনো টাকা পাঠিয়ে দিতেন, কখনো শুধু দুটো কথা বলেই মনে সাহস জোগাতেন।তখন বুঝেছি, মায়ের সাথে সন্তানের সম্পর্কটা শুধু কাছে থাকায় সীমাবদ্ধ নয়—এটা হৃদয়ের, অনুভূতির এক অদৃশ্য বন্ধন। দূরত্ব যতই হোক, সেই টান কখনো কমে না।আজ আমি যত বড়ই হই না কেন, যত দূরেই যাই না কেন—মায়ের কাছে আমি সেই ছোট্ট সন্তানই রয়ে গেছি। আর আমার কাছে মা মানেই এক অদৃশ্য ছায়া, এক নিরাপদ আশ্রয়, এক অফুরন্ত ভালোবাসার নাম।
মা, তুমি আছো বলেই জীবনটা এত সুন্দর, এত পূর্ণ।