মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার মালখানগর ইউনিয়নের কাজীরবাগ গ্রামের কৃতী সন্তান, বীর মুক্তিযোদ্ধা ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট (অব.) জামাল উদ্দিন চৌধুরী (এমপি) বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন সাহসী সংগঠক, সাব-সেক্টর কমান্ডার এবং জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন। স্বাধীনতার সংগ্রামে তাঁর নেতৃত্ব, সাহসিকতা ও দেশপ্রেম আজও নতুন প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয়।
১৯৩২ সালের ১১ অক্টোবর ঐতিহ্যবাহী কাজীরবাগ গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা কাজিম উদ্দিন চৌধুরী এবং মাতা আমিরন নেসা। তিনি ছিলেন দেশের বিশিষ্ট শিল্পোদ্যোক্তা আবদুর রউফ চৌধুরীর বড় ভাই। একজন দেশের স্বাধীনতার জন্য অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন, অন্যজন শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রেখেছেন—দুই ভাইয়ের অবদানই বাংলাদেশের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়।
১৯৫২ সালে পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে ক্যাডেট হিসেবে যোগ দিয়ে পরবর্তীতে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট পদে উন্নীত হন। তবে দেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে তিনি সামরিক চাকরির চেয়ে জাতির মুক্তিকেই বড় করে দেখেছিলেন।
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে সিরাজদিখান, শ্রীনগর ও লৌহজং এলাকার জনগণের ভোটে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হন। বাঙালির অধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে তিনি ছিলেন দৃঢ়চেতা নেতা।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের পর নিজ এলাকায় ফিরে তরুণদের সংগঠিত করেন। সীমিত অস্ত্র নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে তিনি লাঠি, বল্লম, শিকারি বন্দুকসহ বিভিন্ন অস্ত্রের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। ২৫ মার্চের গণহত্যার পর ভারতে গিয়ে মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে ৮ নম্বর সেক্টরে যোগ দেন। প্রথমে অ্যাডজুট্যান্ট অফিসার এবং পরে সাব-সেক্টর কমান্ডার হিসেবে ফরিদপুরের ভাটিয়াপাড়া, বোয়ালমারীসহ বিভিন্ন এলাকায় সম্মুখযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন।
মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে তাঁর নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী বোয়ালমারীতে প্রবেশ করে এবং ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত তীব্র যুদ্ধ পরিচালনা করে। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের ঘোষণার পরও তিনি একজন দক্ষ সেনানায়কের মতো সহযোদ্ধাদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন। ১৭ ডিসেম্বর ফরিদপুর সার্কিট হাউসে পাকিস্তানি সেনাদের আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক মুহূর্তেরও তিনি ছিলেন প্রত্যক্ষ সাক্ষী।
মুক্তিযুদ্ধের একটি বেদনাদায়ক স্মৃতি তিনি সারাজীবন বয়ে বেড়িয়েছেন। তাঁর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মাত্র ১৩-১৪ বছর বয়সী কিশোর মুক্তিযোদ্ধা হেমায়েত শত্রুসেনাকে গুলি করার পরপরই পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন। ঘটনাটি তাঁকে গভীরভাবে শোকাহত করেছিল।
স্বাধীনতার পর তিনি ফরিদপুর অঞ্চলে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করে আইন-শৃঙ্খলা ও পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখেন। পরে নিজ এলাকায় ফিরে যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে আত্মনিয়োগ করেন।
রাজনৈতিক জীবনেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। ১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে অংশ নেন। পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে ‘মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদ’-এর সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৮২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহে মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদের এক সভায় অংশ নেওয়ার পর হৃদরোগে আক্রান্ত হন। পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে তাঁর প্রিয় বিক্রমপুরের মাটিতে সমাহিত করা হয়।
পরিবারের সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন তাঁর সহধর্মিণী জাহানারা চৌধুরী এবং সন্তান আসমা জাহান চৌধুরী, সালমা জাহান চৌধুরী, আজমা জাহান চৌধুরী, প্রয়াত সাইফুল্লাহ জামাল চৌধুরী ও কাহফিল ওয়ারা চৌধুরী।
বীর মুক্তিযোদ্ধা ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট (অব.) জামাল উদ্দিন চৌধুরী (এমপি)-এর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে অসংখ্য সাহসী মানুষের আত্মত্যাগ ও নেতৃত্ব জড়িয়ে আছে। নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর সংগ্রাম, দেশপ্রেম ও অবদান তুলে ধরা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। ইতিহাসের এই বীর সেনানায়ককে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করা এবং তাঁর অবদান সংরক্ষণ করাই হবে তাঁর প্রতি প্রকৃত সম্মান।
তার সম্পকে আরো জানতে চাইলে যোগাযোগ করুন
সালমা জাহান চৌধুরী
০১৮১৯৯২১২৩৮