১০ লাখ টাকা খরচ করেও একমাত্র ছেলেকে বাঁচাতে পারলাম না’
স্টাফ রিপোর্টার
/ ২৯
জন দেখেছেন
আপডেট :
September 9, 2026
52
দুই মেয়ের পর জন্ম নেওয়া একমাত্র ছেলে আরশাদ উল্লাহ মাহিনকে ঘিরেই ছিল বাবা-মায়ের অনেক স্বপ্ন। ছেলেকে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াবেন, লেখাপড়া শেষ করে প্রতিষ্ঠিত করবেন—এমন পরিকল্পনাই ছিল অবসরপ্রাপ্ত স্টোরম্যান মাহবুবুল বশর চৌধুরী ও নুর বেগমের। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় মাত্র ১৮ বছর বয়সেই সেই স্বপ্নের অপমৃত্যু হয়েছে। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে এখন শোকে পাথর হয়ে আছেন বাবা-মা।
চট্টগ্রাম বন্দরের অবসরপ্রাপ্ত স্টোরম্যান মাহবুবুল বশর চৌধুরী ও নুর বেগমের সংসারে দুই মেয়ের পর জন্ম নেয় আরশাদ উল্লাহ মাহিন। বয়সের ব্যবধান বেশি হওয়ায় বড় দুই বোনের কাছেও মাহিন ছিলেন অত্যন্ত আদরের। বাবা-মায়ের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বড় অংশজুড়েই ছিল ছেলেকে ঘিরে নানা স্বপ্ন।
বড় দুই মেয়ে রুমি আকতার ও ঊর্মি আকতারকে বিয়ে দিয়েছেন মাহবুবুল বশর। তাঁদের স্বামীরা সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকেন। মেয়েদের বিয়ের পর বাবা-মায়ের সবচেয়ে কাছের মানুষ হয়ে উঠেছিলেন মাহিন। এইচএসসি পরীক্ষা শেষে ভালো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা শেষ করবেন—এমনটাই আশা ছিল পরিবারের। কিন্তু একটি সড়ক দুর্ঘটনা মুহূর্তেই সেই স্বপ্ন শেষ করে দিয়েছে।
গত মঙ্গলবার সকালে হাটহাজারী উপজেলার নাঙ্গলমোড়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডে মাহিনদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বজন ও প্রতিবেশীরা শোকাহত পরিবারটিকে সান্ত্বনা দিতে এসেছেন। ছেলে হারানোর বেদনায় বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন মাহবুবুল বশর ও নুর বেগম। কান্নার মধ্যে কখনো বুক চাপড়ে বিলাপ করছিলেন বাবা, আবার কখনো ছেলের কথা মনে করে জ্ঞান হারাচ্ছিলেন মা।
এর আগে গত বুধবার দুপুরে হাটহাজারীর মির্জাপুর ইউনিয়নের চারিয়া বোর্ড স্কুলের সামনে একটি ব্যক্তিগত গাড়ি ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে দুই গাড়ির নয়জন আহত হন। ঘটনাস্থলেই সিএনজি অটোরিকশার চালক মুহাম্মদ এরশাদ (৩৮) মারা যান। গুরুতর আহত হন এইচএসসি পরীক্ষার্থী মাহিন।
দুর্ঘটনার পর মাহিনকে প্রথমে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে পাঁচ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর তাঁর মৃত্যু হয়। মাহিন হাটহাজারী সরকারি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন।
সোমবার রাত ১০টার দিকে মাহিনের মরদেহ বাড়িতে পৌঁছায়। পরে রাতেই জানাজা শেষে তাঁকে দাফন করা হয়।
ছেলের মৃত্যুর কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন বাবা মাহবুবুল বশর। তিনি বলেন, সেদিন দুপুর ১২টার দিকে পরীক্ষা দিতে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল মাহিন। ছেলেকে বিদায় দিয়ে তিনি জোহরের নামাজ পড়তে যান। নামাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে খবর পান, পরীক্ষাকেন্দ্রে যাওয়ার সময় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে ছেলে।
খবর পেয়ে দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে তিনি ছেলেকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখতে পান। এরপর ছেলেকে বাঁচাতে একের পর এক হাসপাতালে ছুটেছেন। চিকিৎসার পেছনে নিজের অবসরকালীন ভাতা ও দীর্ঘদিনের জমানো অর্থসহ প্রায় ১০ লাখ টাকা খরচ করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছেলেকে বাঁচাতে পারেননি।
মাহিনের চাচাতো ভাই ও ব্যবসায়ী মুহাম্মদ ফারুক জানান, মাহিনের চিকিৎসায় তাঁর বাবার প্রায় ১০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। ছেলেকে সুস্থ করে বাড়িতে ফেরানোর আশায় অবসরকালীন পাওয়া অর্থ এবং সঞ্চয়ের টাকা পর্যন্ত ব্যয় করেছেন তিনি। কিন্তু চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টার পরও মাহিনকে আর ফেরানো সম্ভব হয়নি।
হাটহাজারী সরকারি কলেজের প্রভাষক মো. আবু তালেব বলেন, মাহিন তাঁদের কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন। তাঁর অকালমৃত্যুতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে শোক নেমে এসেছে। সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে প্রশাসনিক তৎপরতা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা আরও জোরদারের দাবি জানান তিনি।
একটি দুর্ঘটনা শুধু একটি তরুণ প্রাণই কেড়ে নেয়নি, ভেঙে দিয়েছে একটি পরিবারের ভবিষ্যতের স্বপ্নও। অবসরজীবনে একমাত্র ছেলেকে ঘিরে যে আশা নিয়ে দিন কাটানোর কথা ছিল মাহবুবুল বশরের, এখন সেই ঘরজুড়ে কেবল সন্তান হারানোর শূন্যতা।