কাজী হাবিবুর রহমান
লেখক, সদস্য ও উপদেষ্টা, ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতাল ট্রাস্ট, ঢাকা।
পাবনা শহরের মাঝখান দিয়ে ইছামতী নদী প্রবাহিত হয়েছে। এই নদী দখলদারদের কবলে পড়ে বর্তমানে মৃতপ্রায়। প্রতি বছর নদীর দখলদারদের উচ্ছেদের জন্য চিৎকার চেঁচামেচি হয় কিন্তু কাজের কাজ ‘কিছু হয় না। একজন মহিলা অধ্যাপিকা, যিনি এই ইছামতীর তীরে তার বাল্যকাল, শৈশবও যৌবনকাল পার করেছেন, তিনি অতীব দুঃখের সাথে বলেছেন, “আমরা কি ফিরে পাবো সেই স্বচ্ছতন্বী ইছামতীকে আমার শৈশব, আমার সত্তা, আমার স্বপ্ন হারানোর বেদনায় আমি কুঁকড়ে আছি। নদীর মৃত্যুতে সভ্যতার মৃত্যু হয়”। তাঁর উক্ত তিনটি বাক্য আমার হৃদয়কৈ তোলপাড় করেছে। আমার হৃদয়টা হাহাকার করে উঠেছে। সত্যইতো আমার যৌবনকালে ইছামতীকে আমি যৌবনবতী দেখেছি।
এবার আসুন ইছামতী নদী নিয়ে আমরা কিছু আলোচনা করি। ইছামতী নদী এবং পাবনা শহর সম্পর্কে এমন সব কথা বলবো, যা আমরা অনেকেই জানিনা। পাবনা জেলা ঘিরে বয়ে চলেছে দুইটি বৃহৎ নদী, দক্ষিনে পদ্মা আর পূর্বে যমুনা নদী। এই দুইটি বিখ্যাত বৃহৎ নদীকে ইছামতী নদী সংযোগ করেছে। আর এই সংযোগ স্থাপন করতে গিয়ে ইছামতী, নদী পাবনা শহরের বুক চিড়ে প্রবাহিত হয়েছে, অর্থাৎ পাবনা শহরকে সম্পূর্ণরূপে দ্বিখন্ডিত করেছে ইছামতী নদী, যেমন ‘দানিউব নদী দুই তীরে দুই দুর্গকে- বুদা ও পেস্টকে রেখে তাদের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে আপন আনন্দে। আমি যৌবনবতী ইচ্ছামতী নদীকে আমার যৌবন কালে পাবনা শহরকে দুই ভাগ করে আপন আনন্দে বয়ে যেতে দেখেছি। ইছামতীকে পুনরায় সেইরূপ বহমান করা যায় না?
এবার আরেকটি অবাক করা কথা বলি। ইছামতী নদী কিন্তু কোন প্রাকৃতিক নদী নয়। এটা একটি মানুষ কর্তৃক খনন করা খাল যা দুইটি বিখ্যাত নদী পদ্মা এবং যমুনার মাঝে সংযোগ স্থাপন করেছে। সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে সুবাহ বাংলার সুবেদার ইসলাম খান মুঘল নৌবাহিনীর জলতরীগুলোকে নদী দিয়ে চলাচলের জন্য খাল খনন করে পদ্মা এবং যমুনার মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেন। প্রচলিত ইতিহাস মতে, ইসলাম খানের নামের সাথে নাম মিলিয়ে খননকৃত খালের নাম রাখা হয় ইছামতী। তাই ইছামতীকে একটি ঐতিহাসিক নদীও বলা যায়। তবে আমরা, ইছামতীকে তন্বী বা যৌবনবতী নদী হিসাবেই চিনি, কোন খাল নয়। কবি ঈশ্বরচন্দ্রগুপ্ত নৌকায় ইছামতীর উপর দিয়ে ভ্রমণ করেছেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর বজরায় ইছামতী নদীর উপর দিয়ে পরিভ্রমণ করেছেন বেশ কয়েকবার। তাঁরা দুজনেই তাঁদের গদ্য এক পদ্যে সেই সর্ব ভ্রমণ অভিজ্ঞতার কথা সুললিত ভাষায় লিখেছেন, যা পাঠ করে আমরা হই মুগ্ধ ও গর্বিত।
আমি এই লেখার এক স্থানে বলেছি, আমি ইছামতীকে যৌবনবতী দেখেছি। আমার পিতা চাকুরি থেকে অবসর পাওয়ার পর আমরা পাবনায় এলাম। আমরা নতুন বাড়ী স্থাপন করলাম ইছামতী নদী থেকে খুব বেশী দূর হলে বলা যায় মাত্র ৬০/৭০ গজ দূরে। আমি এডওয়ার্ড কলেজে
আই. এ. এবং বি.এ. পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলাম এম.এ পড়তে ১৯৫৭ সালে। তখন অবলোকন করেছিলাম শীতকালে ইছামতী একটু শীর্ণ দেখাতো, তবুও খুব ধীরে ধীরে স্রোত বইত। বর্ষায় তখন হতো সে পূর্ণ যৌবনরতী। তীরে উপচে জলরাশি উঠতো। বড় বড় গয়নার নৌকা ৫০০/৬০০ মন মাটির তৈজষপত্র বিক্রির জন্য ঘাটে এসে ভিড়ত। নগরবাড়ী এবং অন্যান্য ঘাট থেকে ৩০/৪০ সীটের ভটভটি লঞ্চ আসতো যাত্রী নিয়ে। আমাদের বাড়ীর সামনে, বর্তমানে যেখানে ইসলামী লাইব্রেরী স্থাপন করা হয়েছে, সেই ঘাটে যাত্রী ওঠানামা করতে দেখছি। আরো ব্যক্তিগত কথা বলি, আমার এক ভগ্নিপতি যার বাড়ী ছিল নগরবাড়ী, তিনি তখন স্কুল পড়ুয়া ছাত্র, তাঁর দাদার সাথে সেই ভটভটা লঞ্চে নগরবাড়ী থেকে পাবনা আসতেন কোর্ট-কাচারী করার জন্য। দাদার সাথে তিনি ওই ঘাটে নামতেন। সেই ইছামতী নদী আর নেই। জমি দখলদাররা তাকে হত্যা করেছে। ইছামতী নদীর বর্তমান অবস্থা দেখলে আমার হৃদয়টা হাহাকার করে ওঠে। সভ্যলোকে নদীকে হত্যা করে কেন, এর উত্তর কেউই দিতে সক্ষম নন।
একবার ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে ইছামতী নদীর উপর থেকে দখলদার উচ্ছেদ করার জন্য হাইকোর্ট থেকে নির্দেশ এলো। সে সময় ইছামতীর উপর ২০১৪ সালে ফেসবুকে আমার এক ইংরেজীতে লেখা প্রবন্ধের কপি ডিসি জনাব কবির মাহমুদকে প্রেরণ করেছিলাম ১৪ জানু ২০২০ তারিখে।
ডিসি সাহেবকে আমার কভারিং পত্রে লিখেছিলাম, “ইছামতী নদীর, মধ্য থেকে দখলদারদের উচ্ছেদ করে পুনঃখনন করে নদীকে নাব্য করার। প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানাই।” তখন কিছুদিন খুব জোরেসোরে মুঘলখিলদারদের উচ্ছেদ করা শুরু হলো। কিন্তু আস্তে আস্তে উচ্ছেদ কর্ম, স্তিমিত হয়ে এলো, এক সময় কাজ থেমেই গেল। তারপর প্রতি বছর একই ঘটনা ঘটছে। আমার সেই ২০১৪ সালের ফেসবুকে ইংরেজীতে। লেখাটির শেষ অংশ ছিল নিম্নরূপ-
“Lastly, lappeal to the inhabitants of Pabna to get the water of the river Ichhamoti flowing once again by driving away the Land grabbers. If it is done, Pabna town will be a beautiful city, more beautiful city, more beautiful than Budapest and you will save an historical site for the posterity.”
সত্যই কি ইছামতী নদীর যৌবনকাল ফিরিয়ে আনা সম্ভব? ইউরোপ এবং অনেক সভ্য দেশের মানুষরা মৃত নদীকে বহমান অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সক্ষম। আমরা পারিনা কেন?’ আমাদের গরবর্তী প্রজস্যকে কি উত্তর দেবো? হায়রে ইছামতী নদী!