সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬, ১২:২১ পূর্বাহ্ন
এই মুহূর্তের খবর :
মাওয়া হাইওয়ের পাশে নিমতলা ব্রিজ সংলগ্ন ইছামতি নদী দখলের অভিযোগ, অস্তিত্ব সংকটে নদী গ্যাসসংকটে শিল্প খাত বিপর্যস্ত, উৎপাদন ও রপ্তানিতে বাড়ছে শঙ্কা সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের দায়মুক্তি নিয়ে বিতর্ক: ব্যক্তিগত অপরাধের বিচার সম্ভব বলে মত আইন বিশেষজ্ঞদের মায়ের সেবা – মো: আশিকুর রহমান স্বাধীন পরিবেশ রক্ষায় দেশব্যাপী ৮ লাখ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন PRP থেরাপি: শরীরের নিজের শক্তিতেই সুস্থতার নতুন সম্ভাবনা -ডাঃ চৈতী মালাকার শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ সার সংকটের আশঙ্কায় খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে, বিপদে পড়তে পারেন ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ: ডব্লিউএফপি মুন্সীগঞ্জের গর্ব বীর মুক্তিযোদ্ধা ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট (অব.) জামাল উদ্দিন চৌধুরী (এমপি): মুক্তিযুদ্ধের সাহসী সেনানায়কের জীবন ও অবদান গ্রামীণ সড়কে বারবার পিচ উঠে যাওয়া: টেকসই সমাধানে আরসিসি সড়ক নির্মাণের দাবি

পাবনার প্রাণের নদী কি আবারও ফিরে পাবে তার হারানো যৌবন?

স্টাফ রিপোর্টার / ৫১ জন দেখেছেন
আপডেট : July 15, 2026

লেখক কবি মো: আশিকুর রহমান স্বাধীন

একটি নদী শুধু পানির প্রবাহ নয়; একটি জনপদের ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও মানুষের আবেগের ধারক। পাবনার ইছামতি নদীও তেমনই একটি নদী। একসময় যার বুক চিরে সারাদিন চলত পালতোলা নৌকা, জেলেদের মাছ ধরার ব্যস্ততা, কৃষকের পণ্যবাহী নৌযান আর শিশু-কিশোরদের আনন্দ-উচ্ছ্বাস। আজ সেই নদীর অনেক অংশে পানি নেই, কোথাও দখল, কোথাও ময়লার ভাগাড়, আবার কোথাও কৃষিজমিতে পরিণত হয়েছে নদীর বুক।পাবনার প্রবীণদের কাছে ইছামতি শুধু একটি নদী নয়, এটি স্মৃতির ভাণ্ডার। নতুন প্রজন্মের অনেকেই বিশ্বাস করতে চায় না যে, আজ যেখানে আগাছা ও মাটি জমে আছে, সেখানে একসময় নৌকা চলত, মানুষ গোসল করত, মাছ ধরত এবং বিকেলে নদীর পাড়ে বসে গল্পে মেতে উঠত।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ইছামতির অবদান

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ইছামতি নদী ছিল গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানি সেনাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা এই নদীপথ ব্যবহার করে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যাতায়াত করতেন। স্থানীয় মাঝি ও সাধারণ মানুষ নিজের জীবন বাজি রেখে মুক্তিযোদ্ধাদের নৌকায় পারাপার করিয়ে সহযোগিতা করেছিলেন।

স্বাধীনতার ইতিহাসে এই নদীর অবদান নিয়ে খুব বেশি আলোচনা না হলেও, স্থানীয় মানুষের স্মৃতিতে সেই অধ্যায় আজও অম্লান।

শৈশবের আনন্দের নাম ছিল ইছামতি

একসময় স্কুল ছুটি মানেই ছিল বন্ধুদের সঙ্গে ইছামতি নদীতে ছুটে যাওয়া। কেউ সাঁতার কাটত, কেউ মাছ ধরত, কেউ নৌকায় ঘুরে বেড়াত। বর্ষাকালে নৌকাভ্রমণ ও বনভোজন ছিল সাধারণ ঘটনা।

নদীর পাড়ে বাদাম, চানা কিংবা মুড়ি নিয়ে আড্ডা ছিল বহু পরিবারের বিকেলের নিয়মিত আয়োজন। ঈদ, পূজা কিংবা ছুটির দিনে নদীর তীর মুখর থাকত মানুষের পদচারণায়।

আজ সেই দৃশ্য অতীতের গল্প হয়ে গেছে।

ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র

পাবনার ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল ইছামতি নদী। কৃষিপণ্য, পাট, ধান, চালসহ নানা পণ্য নৌকাযোগে পরিবহন করা হতো। নদীকেন্দ্রিক বাজার ও জনপদ গড়ে উঠেছিল, যা জেলার অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেছিল।

ঐতিহাসিকভাবে পাবনা শহরের বিকাশও এই নদীকে ঘিরেই হয়েছে।

নদীর পরিচিতি

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) অনুযায়ী, ইছামতি নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ৪৪ কিলোমিটার এবং গড় প্রস্থ ১২০ মিটার। এটি পাবনা সদর উপজেলার ভাড়ারা ইউনিয়নে পদ্মা নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে পাবনা শহর অতিক্রম করে বেড়া উপজেলার দিকে প্রবাহিত হয়ে হুরাসাগর নদীতে মিলিত হয়েছে। নদীটির একমাত্র শাখা আত্রাই নদী (পাবনা)।

মৌসুমি প্রকৃতির এই নদীতে বর্ষাকালে পানি থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে অধিকাংশ অংশ শুকিয়ে যায়। অনেক জায়গায় নদীর তলদেশে সেচের মাধ্যমে কৃষিকাজ করা হয়।

কেন হারিয়ে গেল ইছামতির প্রাণ?

পরিবেশবিদ ও স্থানীয়দের মতে, নদীটির বর্তমান অবস্থার পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ—

  • দীর্ঘদিন নিয়মিত খনন না হওয়া।
  • নদীর উৎস ও প্রবাহপথে পলি জমে নাব্যতা কমে যাওয়া।
  • অবৈধ দখল ও স্থাপনা নির্মাণ।
  • শহরের বর্জ্য ও ড্রেনের পানি নদীতে ফেলা।
  • নদী ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব।
  • উৎস থেকে পর্যাপ্ত পানির প্রবাহ নিশ্চিত না হওয়া।

এসব কারণে নদীটি ধীরে ধীরে তার স্বাভাবিক অস্তিত্ব হারাতে থাকে।

মানুষের প্রশ্ন

পাবনাবাসীর মনে আজও একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খায়—ইছামতি নদী পুনরুদ্ধারের কাজ বারবার শুরু হলেও কেন শেষ পর্যন্ত সফল হয় না?

নদী রক্ষায় গত কয়েক দশকে বিভিন্ন সময় সরকারি উদ্যোগ, প্রকল্প ও অর্থ বরাদ্দের কথা শোনা গেছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, সেই প্রকল্পগুলোর বাস্তব অগ্রগতি কতটুকু? বরাদ্দের অর্থ কীভাবে ব্যয় হয়েছে? নদী কেন এখনো আগের রূপ ফিরে পেল না?

এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চান সচেতন নাগরিক, পরিবেশকর্মী ও নদীপ্রেমীরা।

নতুন আশার আলো

নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে ২০২৪ সালে প্রায় হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা ব্যয়ে খালসহ প্রায় ১১০ কিলোমিটার নদী খননের একটি বৃহৎ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়।

এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ইছামতি নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি, পানি ধারণক্ষমতা উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং পরিবেশ পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।

তবে স্থানীয়দের মতে, শুধু খনন করলেই হবে না। নদীকে দখলমুক্ত রাখা, দূষণ বন্ধ করা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করলেই প্রকল্পের সুফল দীর্ঘস্থায়ী হবে।

নদী বাঁচলে বাঁচবে ইতিহাস

ইছামতি নদীকে ঘিরে গড়ে উঠেছে পাবনার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জনজীবন। তাই এই নদীকে বাঁচানো মানে কেবল একটি জলধারা ফিরিয়ে আনা নয়; বরং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, ঐতিহ্য, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ করা।

আজও পাবনার অনেক প্রবীণ মানুষ নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে বলেন, একসময় এই নদীতে সারাদিন নৌকা চলত, মানুষ গোসল করত, মাছ ধরত। এখন সেই নদীকে চিনতেই কষ্ট হয়।”

পাবনাবাসীর প্রত্যাশা—ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে ইছামতি নদী আবারও তার হারানো রূপ ফিরে পাক। কারণ একটি নদী হারিয়ে গেলে শুধু পানি হারায় না, হারিয়ে যায় একটি জনপদের ইতিহাস, স্মৃতি ও পরিচয়।

 


অন্যান্য সংবাদ