রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের বহুল আলোচিত ‘বালিশকাণ্ড’ দুর্নীতির মামলার বিচারাধীন আসামি ও ঠিকাদার শাহাদাত হোসেনের পাবনা জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সদস্য হিসেবে সভায় উপস্থিতি নিয়ে জেলা জুড়ে নানা মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। একজন বিচারাধীন দুর্নীতির মামলার আসামি কীভাবে জেলার গুরুত্বপূর্ণ আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক নীতিনির্ধারণী কমিটির সদস্য হিসেবে সভায় অংশগ্রহণ করছেন—এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন নাগরিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় শাহাদাত হোসেনকে পাবনা জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে বর্তমানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায়ও তিনি সদস্য হিসেবে অংশ নিচ্ছেন। তার এই অংশগ্রহণের আইনি ভিত্তি, প্রশাসনিক অনুমোদন কিংবা কোন সরকারি আদেশের আলোকে তিনি এখনও সদস্য হিসেবে বহাল আছেন—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ফোরাম। জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অপরাধ দমন, মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, জননিরাপত্তা এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে এ কমিটিতে আলোচনা হয়। ফলে এমন একটি কমিটিতে দুর্নীতির মামলায় বিচারাধীন একজন ব্যক্তির সদস্য হিসেবে উপস্থিতি জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
এদিকে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের বহুল আলোচিত ‘বালিশকাণ্ড’ দুর্নীতির ঘটনায় শাহাদাত হোসেনের নাম বহু আগে থেকেই আলোচনায় আসে। ২০২০ সালে প্রকাশিত বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, রূপপুর প্রকল্পে আসবাবপত্র সরবরাহে অনিয়ম এবং প্রায় ১৬ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার বিরুদ্ধে দুটি পৃথক মামলা দায়ের করে। অভিযোগে বলা হয়, প্রকল্পে বিভিন্ন আসবাবপত্র ক্রয় ও পরিবহনে ব্যাপক অনিয়ম এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে।
মামলা দায়েরের পর শাহাদাত হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হলেও পরবর্তীতে তিনি আদালত থেকে জামিন লাভ করেন। একই সময়ে তার বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য দুদক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করে। বর্তমানে মামলাগুলো বিচারাধীন রয়েছে।
উল্লেখ্য, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের ‘বালিশকাণ্ড’ দেশের অন্যতম আলোচিত দুর্নীতির ঘটনায় পরিণত হয়েছিল। প্রকল্পের একটি বালিশ কেনা, বহন এবং ভবনের নির্দিষ্ট কক্ষে পৌঁছে দেওয়ার জন্য অস্বাভাবিক ব্যয় দেখানো হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশের পর দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয় এবং সরকারি অর্থ অপচয় ও দুর্নীতির প্রতীক হিসেবে ‘বালিশকাণ্ড’ ব্যাপক আলোচিত হয়। পরে দুদক তদন্ত শেষে প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা, প্রকৌশলী ও ঠিকাদারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে মামলা দায়ের করে।
এমন প্রেক্ষাপটে বিচারাধীন দুর্নীতির মামলার একজন আসামির জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সদস্য হিসেবে সভায় নিয়মিত অংশগ্রহণ প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্টরা জানতে চাইছেন, একজন বিচারাধীন আসামিকে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ কমিটির সদস্য হিসেবে বহাল রাখার বিধান কী, তার নিয়োগ বা বহাল থাকার পেছনে কোন সরকারি নির্দেশনা রয়েছে এবং বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে কি না।
সচেতন নাগরিকদের মতে, আইনশৃঙ্খলা কমিটির মতো গুরুত্বপূর্ণ ফোরামের সদস্য নির্বাচন ও মনোনয়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, গ্রহণযোগ্যতা এবং নৈতিকতার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়া উচিত। বিচারাধীন দুর্নীতির মামলার একজন আসামির সদস্য হিসেবে উপস্থিতি জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে এবং প্রশাসনের ভাবমূর্তিও প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে বিষয়টির আইনি ও প্রশাসনিক ভিত্তি সম্পর্কে দ্রুত স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন জেলার সচেতন মহল।