লেখক : কাজী হাবিবুর রহমান (পান্না )- উপদেষ্টা ও ট্রাষ্টি, ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতাল
২০১৩ সালের ২২ জানুয়ারি। পাবনার ক্রীড়াঙ্গনে সৃষ্টি হয়েছিল এক অনন্য ইতিহাস। পাবনা কমিউনিটি হাসপাতাল ও পাবনা কমিউনিটি ক্লিনিকের উদ্যোগে প্রথমবারের মতো বিদ্যুতের আলোয় দিবা-রাত্রির মহিলা ক্রিকেট টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হয়েছিল। সে সময় এমন আয়োজন শুধু পাবনায় নয়, দেশের অনেক জায়গাতেই ছিল বিরল। নারী ক্রিকেটকে উৎসাহিত করতে এই উদ্যোগ ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছিল।
টুর্নামেন্টে চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, সংবাদকর্মী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নারীরা অংশ নেন। মাঠজুড়ে ছিল উৎসবের আমেজ, গ্যালারিভর্তি দর্শক এবং নারী খেলোয়াড়দের প্রতি মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন। খেলাধুলার মাধ্যমে নারীদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি এবং সামাজিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার এক সাহসী উদ্যোগ ছিল এটি। সেই সময়ের অন্যতম উদ্যোক্তারা বিশ্বাস করতেন, নারীদের খেলাধুলায় সম্পৃক্ততা শুধু বিনোদন নয়, বরং সুস্থ সমাজ গঠনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাদের সেই উদ্যোগের ফলে পাবনার ক্রীড়াঙ্গনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছিল।
কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই ধারাবাহিকতা আর বজায় থাকেনি। আজ পাবনায় এমন দিবা-রাত্রির নারী ক্রিকেট টুর্নামেন্ট প্রায় দেখাই যায় না। যে মাঠ একসময় নারী ক্রিকেটারদের পদচারণায় মুখর ছিল, সেখানে এখন নীরবতা। প্রশ্ন উঠছে—কেন থেমে গেল এমন একটি ব্যতিক্রমী আয়োজন?
এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে বলে ক্রীড়াসংশ্লিষ্টরা মনে করেন। নিয়মিত পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, সংগঠিত উদ্যোগের ঘাটতি, নারী ক্রীড়ার জন্য পর্যাপ্ত বাজেট না থাকা, মাঠ ও অনুশীলনের সুযোগ সীমিত হয়ে যাওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব—এসবই নারী ক্রিকেটের গতি কমিয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি সামাজিক উৎসাহও আগের তুলনায় অনেকটাই কমে এসেছে।
অথচ বর্তমানে বাংলাদেশের নারী ক্রিকেট আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্যের স্বাক্ষর রাখছে। জাতীয় দলের অর্জন নতুন প্রজন্মের মেয়েদের অনুপ্রাণিত করছে। এমন সময়ে জেলা পর্যায়ে যদি আবার নিয়মিত নারী ক্রিকেট প্রতিযোগিতা আয়োজন করা যায়, তাহলে নতুন প্রতিভা গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হবে। দ্বিতীয় বারের মত কোন পাড়াতে বিদ্যুতের আলোয় মহিলা ক্রিকেট খেলা অনুষ্ঠিত হয়। ২ দিন ব্যাপী পাবনা কমিউনিটি ক্লিনিকের উদ্যোগে বার্ষিক পুনর্মিলনী উপলক্ষে বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালা শুরু হয়।( ২১-০১-২০১৩,২২-০১-২০১৩)
২২/০১/২০১৩ ছিল ডে-নাইট মহিলাদের ক্রিকেট প্রতিযোগিতা। দর্শকদের ব্যাপক উপস্থিতিতে, বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে বিকেলে শুরু হয় ক্রিকেট প্রতিযোগিতা। রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত বিদ্যুতের আলোয় মহিলাদের এই ক্রিকেট খেলায় ইন্সটিটিউট অব কমিউনিটি হেলথ (সবুজ জার্সি), পাবনা কমিউনিটি ক্লিনিক (নীল জার্সি), পাবনা কমিউনিটি হাসপাতাল (হলুদ জার্সি) ও দৈনিক জোড়বাংলা
দ্বিতীয় বারের মত পাবনা কমিউনিটি ক্লিনিকের উদ্যোগে দিব-রাত্রির মহিলা ক্রিকেট টুর্নামেন্টের খেলোয়াড়দের সাথে পরিচিত হচ্ছেন ছবিতে ডাঃ মুস্তাক আহমেদ ও প্রফেসর ডাঃ কাজী কামরুজ্জামান, পাশে খেলা ও উপস্থিত দর্শকদের একাংশ। (আকাশী নীল জার্সি) পরে অংশ গ্রহণ করে। দ্বিতীয় রাউন্ডের ফাইন্যাল খেলায় পাবনা কমিউনিটি হাসপাতাল ও দৈনিক জোড়বাংলা অংশ গ্রহণ করে। টসে জিতে কমিউনিটি হাসপাতাল ফিল্ডিং এর সিদ্ধান্ত নেয়। দৈনিক জোড়বাংলা ব্যাটিং এ নেমে প্রথমে ১০ ওভারে ৮২ রান করে ৮ উইকেটের বিনিময়ে। জোড়বাংলার সবচে বেশী রান করে নীলা। নীলার রানের সংখ্যা ২৯। এরপর দলীয় রানে রাবেয়া ২৮ রান করে। দলীয় ভাবে জোড়বাংলা অতিরিক্ত রান পায় ১৯। খেলার দ্বিতীয় ভাগে পাবনা কমিউনিটি হাসপাতাল ব্যাটিং এ নেমে বিনা উইকেটে সাড়ে ৭ ওভারে ৮৫ রান সংগ্রহ করে বিজয়ের মালা তাদের ঘরে আনে। তারা অতিরিক্ত রান পায় ২৯। ফলে পাবনা কমিউনিটি হাসপাতাল ১০ উইকেটে জয়লাভ করে চ্যাম্পিয়ন হয়। এর আগে প্রথম খেলায় অংশ গ্রহণ করে ইন্সটিটিউট অব কমিউনিটি হেলথ ও পাবনা কমিউনিটি ক্লিনিক, উভয় দলই পরাজিত হয়। খেলায় ম্যান অব দ্যা ম্যাচ ও সেরা ব্যাটিং হিসাবে মনোনীত হয় পাবনা কমিউনিটি হাসপাতালের ব্যাটিং জিনিয়াস রেশমা। রেশমা ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ ৫৫ রান করে। সেরা বলিং এর গৌরব অর্জন করে একই দলের বৃষ্টি। তিনি হ্যাট্রিক সহ ৬টি উইকেট পান। খেলাটি উদ্বোধন করেন ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতালের ট্রাস্টি কাজী হাবিবুর রহমান।

ছবিতে পাবনা কমিউনিটি ক্লিনিকের উদ্যোগে দিব-রাত্রির মহিলা ক্রিকেট টুর্নামেন্টের খেলার চ্যাম্পিয়ন পাবনা কমিউনিটি হাসপাতাল দল ও রানারআপ দৈনিক জোড়বাংলা দলের খেলোয়াড়বৃন্দ। পাশের ছবিতে ঢা: কাজী কামরুজ্জামান ও ডা: মুস্তাক আহমেদকে দেখা যাচ্ছে ।
দিবা–রাত্রীর মহিলা ক্রিকেট প্রতিযোগিতা : ২০১৩ সালের সেই উদ্যোগ আজও প্রমাণ করে, ইচ্ছা ও পরিকল্পনা থাকলে নারীদের জন্য ব্যতিক্রমী ক্রীড়া আয়োজন সফলভাবে করা সম্ভব। তাই সময়ের দাবি, পাবনার সেই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে আবারও ফিরিয়ে আনা। স্থানীয় প্রশাসন, ক্রীড়া সংগঠন, সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান একযোগে এগিয়ে এলে আবারও বিদ্যুতের আলোয় মুখর হতে পারে পাবনার ক্রিকেট মাঠ। কারণ, একসময় যে আলো নারী ক্রিকেটের স্বপ্ন জাগিয়েছিল, সেই আলো আবারও জ্বলে উঠতে পারে—প্রয়োজন শুধু আন্তরিক উদ্যোগ ও ধারাবাহিক পরিকল্পনার।