আলবেনীয় বংশোদ্ভূত মাদার তেরেসার জন্ম ১৯১০ সালের ২৬ আগস্ট, বর্তমান উত্তর মেসিডোনিয়ার রাজধানী স্কোপিতে। তার প্রকৃত নাম ছিল অ্যাগনেস গঞ্জা বয়াজিউ। বাবা নিকোলা বয়াজিউ ও মা দ্রানা বয়াজিউর কনিষ্ঠ সন্তান ছিলেন তিনি। মাত্র আট বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর মায়ের স্নেহ ও ক্যাথলিক ধর্মীয় মূল্যবোধের মধ্যেই তার বেড়ে ওঠা। ছোটবেলা থেকেই মিশনারিদের মানবসেবার গল্প তাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।
মাত্র ১২ বছর বয়সেই ধর্মীয় জীবন বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন অ্যাগনেস। ১৮ বছর বয়সে পরিবার ছেড়ে আয়ারল্যান্ডে গিয়ে ‘সিস্টার্স অব লোরেটো’-তে যোগ দেন। সেখানে ইংরেজি শিক্ষা শেষ করে ১৯২৯ সালে ভারতে আসেন এবং দার্জিলিংয়ে নবদীক্ষিত সন্ন্যাসিনী হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৩১ সালে প্রথম ধর্মীয় শপথ গ্রহণের সময় তিনি ‘তেরেসা’ নাম গ্রহণ করেন।
১৯৩৭ সালে কলকাতার একটি লোরেটো কনভেন্ট স্কুলে শিক্ষকতা করতে গিয়ে শহরের অসহায় ও দরিদ্র মানুষের জীবন তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ এবং ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ভয়াবহতা তাকে মানবসেবায় সম্পূর্ণভাবে আত্মনিয়োগের অনুপ্রেরণা জোগায়। অবশেষে তিনি শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে মাত্র পাঁচ টাকা হাতে নিয়ে দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জীবন শুরু করেন।
কলকাতার বস্তি ও অলিগলিতে ঘুরে অসহায় মানুষের সেবা করতে করতে ১৯৫০ সালের ৭ অক্টোবর মাত্র ১২ জন সদস্য নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ‘মিশনারিজ অব চ্যারিটি’। পরবর্তীতে এই প্রতিষ্ঠান বিশ্বের শতাধিক দেশে মানবসেবার প্রতীক হয়ে ওঠে। ১৯৫২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন মৃত্যুপথযাত্রীদের জন্য ‘নির্মল হৃদয়’, কুষ্ঠরোগীদের জন্য ‘শান্তিনগর’ এবং ১৯৫৫ সালে অনাথ শিশুদের জন্য ‘নির্মল শিশুভবন’।
ভারতের গণ্ডি পেরিয়ে ১৯৬৫ সালে ভেনেজুয়েলায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘মিশনারিজ অব চ্যারিটি’র প্রথম আন্তর্জাতিক শাখা। এরপর ইউরোপ, আফ্রিকা, এশিয়া ও আমেরিকার বহু দেশে এই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বিস্তৃত হয়। তার নেতৃত্বে হাজার হাজার সেবাকর্মী অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ পান।
মানবসেবায় অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৭৯ সালে তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার এবং ১৯৮০ সালে ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘ভারতরত্ন’ লাভ করেন। তবে জন্মনিয়ন্ত্রণ, গর্ভপাত এবং কিছু ধর্মীয় অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছিল তাকে।
মাদার তেরেসা বিশ্বাস করতেন, ভালোবাসা ও সেবাই পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে বড় শক্তি। তিনি বলতেন, “গতকাল চলে গেছে, আগামীকাল এখনও আসেনি। আমাদের হাতে আছে আজকের দিন—এখনই শুরু করা যাক।” আরেকটি বিখ্যাত উক্তি ছিল, “ঈশ্বর আমাদের সাফল্য চান না, তিনি চান আমরা চেষ্টা করি।”
জীবনের শেষ দিকে হৃদরোগ, নিউমোনিয়া ও ম্যালেরিয়াসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হন তিনি। ১৯৯৭ সালের ১৩ মার্চ ‘মিশনারিজ অব চ্যারিটি’র প্রধানের দায়িত্ব ছেড়ে দেন। একই বছরের ৫ সেপ্টেম্বর তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
মাদার তেরেসার জীবন প্রমাণ করে, মানবসেবার জন্য বিপুল সম্পদের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন আন্তরিকতা, ভালোবাসা এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অদম্য ইচ্ছাশক্তি। মানবকল্যাণে তার অবদান আজও বিশ্বজুড়ে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে রয়েছে।