ডলার ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতিতে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও দেশের অর্থনীতিতে এখনো কাটেনি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের স্থবিরতা। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংক খাত, রাজস্ব ঘাটতি, জ্বালানি সংকট এবং বাড়তে থাকা বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ অর্থনীতির পুনরুদ্ধারকে কঠিন করে তুলেছে।
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ছয় মাসে অর্থনীতিতে বড় ধরনের পতন ঠেকিয়ে কিছুটা স্থিতিশীলতা আনতে সক্ষম হলেও এখনো কাঙ্ক্ষিত পুনরুদ্ধারের স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে বেসরকারি বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে গতি ফেরেনি। এর সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহ ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে।
তবে অর্থনীতির বৈদেশিক খাতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন রয়েছে। ডলারের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা যায়নি, প্রবাসী আয় ও রপ্তানি আয়ও বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ ধরে রাখতে সহায়তা করছে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও আগের তুলনায় শক্তিশালী হয়েছে।
মূল্যস্ফীতিও জুলাইয়ে কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমেছে। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে পণ্যের দাম বাড়তে থাকায় সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা এখনো আগের অবস্থায় ফিরতে পারেনি।
সংকটের উত্তরাধিকার
গত কয়েক বছরে দেশের অর্থনীতি একাধিক সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। ডলারের সংকট, রিজার্ভ কমে যাওয়া, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতে অনিয়ম, ঋণখেলাপি বৃদ্ধি এবং বড় বড় প্রকল্পে বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়িয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বৈদেশিক মুদ্রাবাজার ও ব্যাংক খাতে কিছু সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ডলারের সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির পাশাপাশি রিজার্ভও বাড়তে শুরু করে। বর্তমান সরকার সেই স্থিতিশীলতা ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
তবে অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো এখনো রয়ে গেছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বিনিয়োগ বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্যাংক খাতকে শক্তিশালী করা এবং রাজস্ব আদায় বাড়ানো সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাজারে স্বস্তি ফেরেনি
দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও বাজারে তার সুফল এখনো সাধারণ মানুষের কাছে খুব বেশি দৃশ্যমান নয়।
বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছেন। কয়েক বছর ধরে পণ্যের দাম যেভাবে বেড়েছে, সেই তুলনায় মজুরি না বাড়ায় মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। ফলে মূল্যস্ফীতি সামান্য কমলেও মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফেরাতে আরও সময় লাগবে।
সরকার সীমিত আয়ের মানুষকে সহায়তা দিতে ফ্যামিলি কার্ডসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। তবে মধ্যবিত্তের জন্য মূল্যস্ফীতির চাপ এখনো বড় সমস্যা।
রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি
অর্থনীতির আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো রাজস্ব আদায়ে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়া। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব আদায়ে প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজস্ব ব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এই পরিস্থিতির পরিবর্তন কঠিন। কর প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানো, করের আওতা সম্প্রসারণ এবং রাজস্ব আদায়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
রাজস্ব ঘাটতি বাড়লে সরকারের উন্নয়ন ব্যয় ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি পরিচালনার সক্ষমতার ওপরও চাপ তৈরি হয়। একই সঙ্গে দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ার আশঙ্কা থাকে।
বিনিয়োগে মন্দা, কর্মসংস্থানেও স্থবিরতা
অর্থনীতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক জায়গাগুলোর একটি হলো বিনিয়োগ। এক দশকের বেশি সময় ধরে বেসরকারি বিনিয়োগে কাঙ্ক্ষিত গতি নেই। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও এই পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন হয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির ঋণপত্র নিষ্পত্তি আগের বছরের তুলনায় প্রায় সাড়ে ১০ শতাংশ কমেছে। শিল্পের মধ্যবর্তী পণ্য ও কাঁচামাল আমদানিতেও পতন দেখা গেছে।
অর্থাৎ উদ্যোক্তারা নতুন শিল্প স্থাপন বা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে এখনো সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। এর প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থানের ওপরও।
বিশেষ করে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। নতুন বিনিয়োগ না হলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হয় না।
ব্যবসার পরিবেশ সহজ করতে সরকার জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন করেছে। বন্ধ ও লোকসানি রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বেসরকারি বিনিয়োগ আনার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে বিনিয়োগে কিছুটা গতি ফিরতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
ডলার ও রিজার্ভে ইতিবাচক চিত্র
অর্থনীতির বৈদেশিক খাতে বর্তমানে তুলনামূলক স্বস্তি রয়েছে। ডলারের বাজারে বড় ধরনের সংকট দেখা দেয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে ডলারের দামও মোটামুটি ১২৩ থেকে ১২৪ টাকার মধ্যে স্থিতিশীল ছিল।
প্রবাসী আয় ও রপ্তানি আয় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারকে সবচেয়ে বেশি সহায়তা করছে। কয়েক মাস টানা ৩০০ কোটি ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এলেও জুন ও জুলাইয়ে তা কিছুটা কমেছে। তারপরও সামগ্রিক প্রবাহ এখনো অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক।
প্রবাসী আয় ও রপ্তানি আয়ের ওপর ভর করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বেড়েছে। ১২ আগস্টের হিসাবে দেশের মোট রিজার্ভ ৩ হাজার ৭০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। আইএমএফের হিসাব পদ্ধতি অনুযায়ী রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩ হাজার ২২৬ কোটি ডলার।
এই অবস্থান ডলার বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ব্যাংক খাত এখনো বড় দুর্বলতা
অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের পথে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হয়ে আছে ব্যাংক খাত। বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ, মূলধনের ঘাটতি এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকট এখনো কাটেনি।
ব্যাংক খাত সংস্কারের জন্য একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও এর বাস্তব ফল পেতে সময় লাগবে। খেলাপি ঋণ আদায়, দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন এবং আর্থিক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা এখন জরুরি।
বিশাল অঙ্কের খেলাপি ঋণ ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার সক্ষমতাকেও সীমিত করছে। ফলে নীতি সুদহার কমালেও উদ্যোক্তাদের কাছে সহজে ও কম খরচে ঋণ পৌঁছাবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
নীতি সুদ কমলেও বিনিয়োগ বাড়বে কি?
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ২১ মাস পর গত ৩০ জুলাই নীতি সুদহার কমিয়ে সাড়ে ৯ শতাংশ করেছে। এর ফলে ঋণের খরচ কমবে এবং ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগে উৎসাহিত হবেন—এমন প্রত্যাশা রয়েছে।
তবে শুধু সুদের হার কমালেই বিনিয়োগ বাড়বে না বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদেরা। বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ, স্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা, সহজ ব্যবসায়িক নিয়ম, স্বচ্ছ করব্যবস্থা এবং দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ।
ব্যাংক খাতে আস্থা ও সক্ষমতা ফিরিয়ে আনা না গেলে নীতি সুদ কমানোর সুফলও সীমিত হতে পারে।
জ্বালানি সংকট নতুন বাধা
শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য বর্তমানে সবচেয়ে বড় বাস্তব সমস্যাগুলোর একটি হচ্ছে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট। উৎপাদন নিরবচ্ছিন্ন না থাকলে শিল্পকারখানার খরচ বাড়ে, উৎপাদন কমে এবং নতুন বিনিয়োগের আগ্রহও কমে যায়।
জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা থাকলে বাজারে পণ্যের সরবরাহও ব্যাহত হতে পারে। এতে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
ফলে বিনিয়োগ বাড়াতে হলে শুধু ঋণের সুদ কমানো নয়, শিল্পের জন্য নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাও জরুরি।
বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ
আগামী দিনে সরকারের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে বিদেশি ঋণ পরিশোধ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ বাবদ প্রায় ৪৫০ কোটি ডলার পরিশোধ করেছে, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ।
আগামী বছরগুলোতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালসহ বিভিন্ন প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ শুরু হওয়ায় চাপ আরও বাড়তে পারে।
তাই নতুন ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রকল্পের অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনা করা এবং ঋণ নিয়ে বাস্তব অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করা সরকারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পুনরুদ্ধারের পথে সময় লাগবে
সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতিতে এক ধরনের স্থিতিশীলতা ফিরে এলেও এখনো প্রকৃত অর্থে পুনরুদ্ধার শুরু হয়নি। রিজার্ভ ও ডলার বাজারে স্বস্তি থাকলেও অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির বড় সমস্যাগুলো রয়ে গেছে।
অর্থনীতির গতি ফেরাতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ব্যাংক খাতের সংস্কার, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, রাজস্ব আদায় বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব সমস্যা কাঠামোগত হওয়ায় দ্রুত সমাধান সম্ভব নয়। সরকারের নেওয়া উদ্যোগগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তার ওপরই নির্ভর করবে আগামী দিনের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার।
অর্থাৎ, রিজার্ভে স্বস্তি ফিরলেও অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই এখনো বাকি।