বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৪৩ পূর্বাহ্ন
এই মুহূর্তের খবর :
পাবনার স্কুল থেকে এমআইটি, এরপর নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সেলিম শাহরিয়ার অ্যাফেরিসিস সচেতনতা দিবস আজ : ডা.চৈতী মালাকার রশুনিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের কৃতি সন্তান ডা. সজীব চন্দ্র মন্ডল, চিকিৎসাসেবায় গর্বিত গোটা ইউনিয়ন কাঁচের সেতুতে দাঁড়িয়ে মেঘের দেশে- মো: আনিছুর রহমান ষাট দশকের ক্রিকেট এই বাংলায় সৌদি সামরিক ঘাঁটিতে হুথিদের ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি মধুর কিছু সময়: বেইজিংয়ের স্বর্গের মন্দিরে – মো: আনিছুর ইসলাম নিষিদ্ধ নগরীর নীরব ইতিহাসের পথে – মো: আনিছুর রহমান একই দিনে রাজধানীর দুই এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সাশ্রয়ী চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতে ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতালে সিটি স্ক্যান মেশিন, এনসিসি ব্যাংকের ১ কোটি টাকা অনুদান

পাবনার স্কুল থেকে এমআইটি, এরপর নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সেলিম শাহরিয়ার

নিজস্ব প্রতিবেদন / ১৪ জন দেখেছেন
আপডেট : September 15, 2026

পদার্থবিজ্ঞান, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি ও মহাকর্ষীয় তরঙ্গ গবেষণায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উজ্জ্বল বাংলাদেশি বিজ্ঞানী পাবনার একটি স্কুল থেকে শিক্ষাজীবনের শুরু। এরপর ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ঢাকা কলেজে উচ্চমাধ্যমিক। সেখান থেকে পাড়ি যুক্তরাষ্ট্রে—বিশ্বের অন্যতম সেরা প্রযুক্তি ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি)। একের পর এক উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের পর এখন তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক। বলছি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিজ্ঞানী সেলিম এম. শাহরিয়ারের কথা।

পদার্থবিজ্ঞান, আলোকবিজ্ঞান, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি, অতি সংবেদনশীল পরিমাপ এবং মহাকর্ষীয় তরঙ্গ নিয়ে দীর্ঘদিনের গবেষণাকর্ম তাঁকে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানমহলে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে গেছে।

পাবনায় শৈশব, ঢাকা কলেজে উচ্চমাধ্যমিক ১৯৬৪ সালে জন্ম নেওয়া সেলিম শাহরিয়ারের শৈশব ও স্কুলজীবন কেটেছে পাবনায়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার পর তিনি ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন।উচ্চশিক্ষার জন্য এরপর যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান তিনি। ভর্তি হন বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (MIT)-তে।

এমআইটিতে তাঁর একাডেমিক সাফল্য ছিল উল্লেখযোগ্য। ১৯৮৬ সালে তিনি একই সঙ্গে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কম্পিউটার সায়েন্স এবং পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর ১৯৮৯ সালে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতকোত্তর এবং ১৯৯২ সালে একই বিষয়ে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। তাঁর পিএইচডি গবেষণায় তিন স্তরবিশিষ্ট পরমাণুর মৌলিক বৈশিষ্ট্য এবং এর ব্যবহার নিয়ে কাজ করা হয়।

এমআইটিতে দীর্ঘ গবেষণাকর্ম পিএইচডি অর্জনের পরও এমআইটির সঙ্গে তাঁর গবেষণার সম্পর্ক অব্যাহত থাকে। তিনি এমআইটির Research Laboratory of Electronics (RLE)-এ পোস্টডক্টরাল গবেষক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৯২ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত তিনি সেখানে গবেষণা বিজ্ঞানী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালে তিনি প্রধান গবেষণা বিজ্ঞানীর দায়িত্ব পান। পরবর্তী সময়ে তিনি নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে যোগ দেন। ২০০৮ সাল থেকে সেখানে অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমানে তিনি বিশ্ববিদ্যালটির ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক। পাশাপাশি পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং ফলিত পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণার সঙ্গেও তিনি যুক্ত।

গবেষণার বিস্তৃত ক্ষেত্র সেলিম শাহরিয়ারের গবেষণার পরিধি অনেক বিস্তৃত। পরমাণু ও ফোটনিক প্রযুক্তি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, কোয়ান্টাম যোগাযোগ, পারমাণবিক ঘড়ি, পারমাণবিক ইন্টারফেরোমেট্রি, আলোকভিত্তিক তথ্যপ্রযুক্তি, অতি সংবেদনশীল পরিমাপ প্রযুক্তি এবং মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্তকরণ তাঁর উল্লেখযোগ্য গবেষণাক্ষেত্র। নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে তিনি Laboratory of Atomic and Photonic Technologies-এর নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত। সলিড স্টেট ও ফোটনিকস গবেষণাতেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

মহাকর্ষীয় তরঙ্গ গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান সেলিম শাহরিয়ারের বৈজ্ঞানিক জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি হলো মহাকর্ষীয় তরঙ্গ গবেষণা। তিনি আন্তর্জাতিক LIGO Scientific Collaboration-এর সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। ২০০৮ সাল থেকে এই বৈজ্ঞানিক সহযোগিতার কাউন্সিলের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। লিগোর অত্যন্ত সংবেদনশীল ডিটেক্টর ব্যবহার করে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্তকরণের গবেষণায় তাঁর নাম একাধিক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাপত্রে রয়েছে। ২০১৬ সালে প্রকাশিত ঐতিহাসিক গবেষণাপত্রেও তিনি সহলেখক ছিলেন—যে গবেষণায় প্রথমবারের মতো মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্ত করার ঘোষণা দেওয়া হয়।

বিজ্ঞানের ইতিহাস বদলে দেওয়া আবিষ্কার ২০১৬ সালের সেই ঘোষণা ছিল আধুনিক বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। দুটি কৃষ্ণগহ্বরের সংঘর্ষ থেকে উৎপন্ন মহাকর্ষীয় তরঙ্গ পৃথিবীতে পৌঁছালে লিগোর বিজ্ঞানীরা সেই সংকেত শনাক্ত করেন। এর মধ্য দিয়ে আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বাভাস সরাসরি পর্যবেক্ষণের নতুন দ্বার খুলে যায়। মহাবিশ্বকে শুধু আলো বা তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গের মাধ্যমে নয়, মহাকর্ষীয় তরঙ্গের মাধ্যমেও পর্যবেক্ষণের নতুন যুগ শুরু হয়।এই বিশাল আন্তর্জাতিক গবেষণা উদ্যোগের অংশ ছিলেন সেলিম শাহরিয়ার। পরবর্তী সময়েও মহাকর্ষীয় তরঙ্গের অনুসন্ধান, শনাক্তকরণ ও বিশ্লেষণ নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় তিনি যুক্ত থেকেছেন। GW150914, GW170817-সহ লিগোর বিভিন্ন পর্যায়ের মহাকর্ষীয় তরঙ্গ গবেষণার একাধিক প্রকাশনায় তাঁর নাম রয়েছে।

আরও সংবেদনশীল প্রযুক্তি তৈরির গবেষণা মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্তকরণকে আরও নিখুঁত ও সংবেদনশীল করার প্রযুক্তি নিয়েও কাজ করেছেন সেলিম শাহরিয়ার। তাঁর গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো White Light Cavity। মাইকেলসন ইন্টারফেরোমিটারভিত্তিক মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্তকারীর সংবেদনশীলতা বাড়ানোর সম্ভাবনাময় প্রযুক্তি হিসেবে এ নিয়ে গবেষণা করা হয়েছে। এ ছাড়া অতি সংবেদনশীল ঘূর্ণন ও ত্বরণ পরিমাপ, সুপারলুমিনাল রিং লেজার এবং পারমাণবিক ইন্টারফেরোমেট্রি নিয়েও তাঁর গবেষণা রয়েছে।

কোয়ান্টাম প্রযুক্তি থেকে ডার্ক ম্যাটার অনুসন্ধান সেলিম শাহরিয়ারের গবেষণা শুধু মহাকর্ষীয় তরঙ্গের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, কোয়ান্টাম যোগাযোগ, পারমাণবিক ঘড়ি, ডার্ক ম্যাটার অনুসন্ধান, সাধারণ আপেক্ষিকতার পরীক্ষণ, আলোকভিত্তিক তথ্যপ্রক্রিয়াকরণ এবং অত্যন্ত নির্ভুল পরিমাপ প্রযুক্তি নিয়েও তিনি কাজ করেছেন। ১৯৯০-এর দশক থেকে তাঁর গবেষণাগারের প্রকাশনা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়ে আসছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও তাঁর সহলেখকত্বে গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে।

পাবনা থেকে বিশ্ববিজ্ঞানের কেন্দ্রবিন্দুতে পাবনার স্কুলজীবন থেকে শুরু হওয়া সেলিম এম. শাহরিয়ারের শিক্ষাযাত্রা তাঁকে নিয়ে গেছে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান এমআইটিতে। সেখান থেকে উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণার পর তিনি এখন নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনা ও গবেষণায় যুক্ত। পদার্থবিজ্ঞান, আলোকবিজ্ঞান, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি এবং মহাকর্ষীয় তরঙ্গের মতো আধুনিক বিজ্ঞানের জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে তাঁর দীর্ঘ গবেষণা বাংলাদেশের জন্যও গর্বের বিষয়। তাঁর পথচলা প্রমাণ করে—বাংলাদেশের কোনো জেলা শহরের একটি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু হওয়া শিক্ষাযাত্রাও একসময় বিশ্ববিজ্ঞানের সবচেয়ে জটিল প্রশ্নগুলোর গবেষণার কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারে।


অন্যান্য সংবাদ