মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছর: শোকের ক্ষত এখনো অমলিন, অপেক্ষা জবাবদিহির
নিজস্ব প্রতিবেদন
/ ৩১
জন দেখেছেন
আপডেট :
July 21, 2026
55
আজ রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে সংঘটিত বিমান দুর্ঘটনার এক বছর পূর্ণ হলো। ২০২৫ সালের ২১ জুলাই বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিদ্যালয়ের একটি ভবনে বিধ্বস্ত হলে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মচারী ও পাইলটসহ ৩৬ জনের প্রাণহানি ঘটে। এছাড়া শতাধিক মানুষ আহত হন। এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেই দিনের বিভীষিকা এখনো তাড়া করে বেড়ায় স্বজন, সহপাঠী, শিক্ষক এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের।
দুর্ঘটনার পরপরই সারা দেশে শোকের ছায়া নেমে আসে। দগ্ধ ও আহতদের রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গুরুতর আহতদের চিকিৎসা চলে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। দীর্ঘ চিকিৎসার পর অনেকেই বাড়ি ফিরলেও তাদের শরীরে রয়ে গেছে আগুনের ক্ষতচিহ্ন, আর মনে রয়ে গেছে ভয়াবহ সেই দিনের দুঃসহ স্মৃতি। অনেক ভুক্তভোগী এখনো শারীরিক ও মানসিক জটিলতার সঙ্গে লড়াই করছেন।
প্রথম বর্ষপূর্তিতে গভীর শোক ও শ্রদ্ধার সঙ্গে নিহতদের স্মরণ করছে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ পরিবার। বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হচ্ছে এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করা হচ্ছে।
দুর্ঘটনার পর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার ৯ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তিন মাসের তদন্ত শেষে ১৫০ জনের সাক্ষ্য এবং ১৬৮টি তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ৩৩ দফা সুপারিশসহ প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দেওয়া হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, উড্ডয়নজনিত ত্রুটির কারণে প্রশিক্ষণ চলাকালে পরিস্থিতি পাইলটের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং বিমানটি বিদ্যালয়ের ভবনে আছড়ে পড়ে। ভবিষ্যতে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঢাকার বাইরে বিমানবাহিনীর প্রাথমিক প্রশিক্ষণ পরিচালনা, বরিশাল ও বগুড়া বিমানঘাঁটির রানওয়ে সম্প্রসারণ এবং নিরাপদ প্রশিক্ষণ অবকাঠামো গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটি রাজউকের বিল্ডিং কোড পুরোপুরি অনুসরণ করে নির্মিত হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী ভবনে একাধিক সিঁড়ি থাকার কথা থাকলেও সেখানে মাত্র একটি সিঁড়ি ছিল। পর্যাপ্ত জরুরি নির্গমনপথ থাকলে হতাহতের সংখ্যা আরও কম হতে পারত বলে তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণে উঠে আসে।
এক বছর পরও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অনেকেই ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন এবং বিচার প্রক্রিয়ার অগ্রগতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন দুর্ঘটনার পর দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই ট্র্যাজেডির পর বিমান নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার ওপর সামরিক প্রশিক্ষণ ফ্লাইট পরিচালনার ক্ষেত্রে ঝুঁকি মূল্যায়ন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা জরুরি।
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি শুধু একটি দুর্ঘটনার স্মৃতি নয়; এটি অসংখ্য পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতির প্রতীক। এক বছর পরও সেই দিনের বেদনা দেশের মানুষকে মনে করিয়ে দেয়—জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানো রাষ্ট্র ও সমাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।